Saturday, 20 Jun 2026

দেবী দুর্গা হরগৌরী রূপে পুজিতা হন রাজকুসুম গ্রামে

IMG

জঙ্গলঘেরা সবুজে মোড়া রাজকুসুম গ্রাম, যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও আজও গ্রামের ভেজা মাটির চেহারা সযত্নে লালিতপালিত হচ্ছে। এই গ্রামের নামের সঙ্গে হরগৌরী যেন সমার্থক। রাজকুসুম গ্রামের হরগৌরী প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। দেবী দুর্গারূপে তিনি চারদিন পূজিতা হন, আর বাকি সময় তিনি পূজিতা হন হরগৌরী রূপেই। কে তাঁর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা কেউ জানেন না। তবে প্রায় ২৫০ বছর আগের একটি অলৌকিক ঘটনা আজও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। 

বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের পূজিত হরগৌরী। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ধনঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বলেন যে প্রায় ২৫০ বছর আগে এক শাঁখারি গ্রামে এসে শাঁখা বিক্রি করছিলেন। গ্রামের পাশের বিশাল জলাশয়ে এক মহিলা তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে স্নান করছিলেন। শাঁখারিকে দেখে সেই মহিলা তাঁকে শাঁখা পড়িয়ে দিতে বলেন। শাঁখারি ইতস্তত করে বলেন, “মা, আপনি স্নান করছেন, এভাবে কেউ শাঁখা পড়ে না।” উত্তরে মহিলা বলেন, “তোমার ভাবার দরকার নেই, তুমি শাঁখা পড়িয়ে দাও।” শাঁখার দাম চাইলে মহিলা বলেন, ভগবতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির ঠাকুরদালানের ঈশান কোনে কুলুঙ্গিতে পয়সা রাখা আছে।

শাঁখারি মহিলার কথামতো শাঁখা পড়িয়ে বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি যান এবং সেই কথাটি বলতেই সবাই অবাক হয়ে যান। ভগবতী বন্দ্যোপাধ্যায় জানান তাঁর কোনো কন্যাসন্তান নেই এবং তিনি গৃহীসন্ন্যাসী। তারপর কৌতূহলবশত সবাই বাঁধের ঘাটে গিয়ে দেখে, মহিলার কোনো চিহ্ন নেই। শাঁখারি তখন করুণ সুরে বলেন, “কেন আমায় মিথ্যাবাদী বানালে, এ গ্রামের এক মহিলা শাঁখা পড়িয়ে নিয়েছেন।” তখন হঠাৎ করেই জলের থেকে শাঁখা পরা দুটি হাত উঠে আসে।

প্রতিবছর দুর্গাপুজোর চারদিন নিয়মমাফিক দুর্গার আরাধনা করা হয়, এবং তিনদিন ধরে ছাগবলির রীতি পালন করা হয়। বাকি সময় প্রতিদিন তিনবার হরগৌরীর জন্য ভোগ নিবেদন করা হয়—প্রাতে ফলাহার, দুপুরে পঞ্চব্যাঞ্জনসহ অন্নভোগ, আর সন্ধ্যায় লুচি-মিষ্টি ভোগ। ধনঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মাঘ মাসে দেবীর অন্নভোগে বেগুন পোড়া দেওয়া আবশ্যক। দশমীতে হরগৌরীর নিরঞ্জন হয় না। নিরঞ্জনের নিয়ম অনুযায়ী, এটি ১২ বছর অন্তর হয়। তবে যদি কোনো মানতকারী হরগৌরীর প্রতিমা দেবেন বলে মানত করেন, তবেই নিরঞ্জন হয়। নিরঞ্জন শুধু ব্রাহ্মণের কাঁধে চেপেই হয়, এবং বেদী কখনোই শূন্য হয় না—নতুন প্রতিমা বেদীতে স্থাপনের পরেই পুরনো প্রতিমা নিরঞ্জনে যায়। রাজকুসুম গ্রাম চারদিন ধরে হরগৌরী রূপে দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে।

Share: